গোমস্তাপুর উপজেলা প্রতিনিধিঃ
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা,পৃথিবীতে অন্যান্য ভাষার চেয়ে গর্বের এই জন্য যে,তা একটি রাষ্টের জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের ছাড়া আর নেই।আমাদের দেশেই পৃথিবীর একমাত্র ভাষা ভিক্তিক রাষ্ট।মানুষের ভাষা ব্যবহারের সংখ্যা তাত্ত্বিক হিসাবে বাংলা ভাষার অবস্থান সপ্তম।পাকিস্তান সৃস্টির পর থেকেই শাসকগোস্ঠী বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে সমূলে ধ্বংস করার এক গভীর ষড়যক্রে লিপ্ত হয়।পাকিস্থানের সংখ্যাগরিস্ঠ জনগনের মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্টভাষা গ্রহন করতে অনীহা প্রকাশ করে।ধর্মের দোহায় দিয়ে বাংলাভাষার বিরুদ্ধে ষড়যক্র শুরু করে।পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠী ও উর্দুভাষী বুদ্ধি জীবীরা প্রচারনা চালান যেবাংলা ভাষা ও বাঙালী সংস্কৃতি এক নয়।১৯৪৭ সালে মে মাসের ১৭তারিখ চৌধূরী খালিকুজ্জামান এবং জুলায় মাসে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দীন আহম্মেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্টভাষা করার পস্তাব পেশ করেন।তাদের এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার ভাষাবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ড. মুহাম্মদ এনামুল হক সহ বেশ কয়েক জন বুদ্ধিজীবী প্রবব্ধ লিখে প্রতিবাদ করে।১৯৪৭ সালের মধ্যে কামরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠীত গনআযাদি লীগ মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের দাবি জানায়।ওই বছরের ২য় সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে তমদ্দীন মজলিশ গঠিত হয়।এটিই ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগঠন।এই সংগঠনের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর ভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা পাকিস্থানের রাষ্টভাষা বাংলা না উর্দু প্রকাশিত হয়।পুসটতিকাটি রাষ্টভাষা বাংলা দাবির পক্ষে যুক্তি উপস্হাপন করা হয়।ভাষা আন্দোলন কে রাজনৈতিক রুপদানের ক্ষেত্রে তমুদ্দীন মজলিশের উদ্দ্যোগে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে গঠিত হয় রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদ।এর আহ্বায়ক করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নুরুল আমিন ভুঞা।ভাষা আন্দলনের সাথে শুধু সংস্কৃতির প্রশ্নই জড়িত ছিল না রাজনৈতিক অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন ও জড়িত থাকে।পূর্ব বাংলার বেশির ভাগ মিনুষ ছিল এক ভাষী।উর্দুকে রাষ্ট ভাষা করলে বাংলা ভাষাভাষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দিক কর্মচারিদের চাকরি হারানোর আশংকা ছিল।তাই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট ভাষা করার ক্ষেত্রে তারা ছিল অগ্রনি ভুমিকায়।এদের সক্রিয় অংশগ্রহন ভাষা আন্দলন কে বেগবান করে।১৯৫১ সালে প্রথম আদম শূমারিতে দেখা যায় পূর্ব বাংলার ৪.৪০কোটি লোকের মধ্যে ৯৮% বাংলা ভাষায় কথা বলায় অভ্যস্ত।বিপরীতে পূর্ব বাংলায় উর্দু ভাষী সংখ্যা মাত্র ১.১%।আবার সমগ্র পাকিস্তানে বাংলা ভাষী লোকের সংখ্যা ৫৪.৬০% আর উর্দু ভাষায় কথা বলে মাত্র ৩.২% লোক।গনপরিষদের সদস্য ধীরেন্দনাথ দত্ত ১৯৪৮ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গন পরিষদে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট ভাষা করার পস্তাব করেন।খাজা নাজিমুদ্দীন এ পস্তাবের বিরোধীতা করে বলেন যে পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চাই রাষ্ট ভাষা উর্দু হোক।পাকিস্তানের প্রধান মুন্ত্রি লিয়াকত আলি খান পস্তাবটিকে পাকিস্তানের বিবেধ সৃষ্টির অপচেস্টা বলে উল্লেখ করেন।উর্দু লক্ষ কোটি মুসলমানদের ভাষা বলে তিনি বলেন যে পাকিস্তানের রাষ্ট ভাষা কেবল উর্দুয় হতে পারে।শামশুল আলমকে আহ্বায়ক মনোনিত করে বাংলা ভাষা দাবি দিবস হিসাবে ১১ই মার্চ ধর্মঘাট আহ্বান করেন।১১ই মার্চ সর্বাত্নক হরতাল পালিত হয়।এই দিন পিকেটিং করার সময় গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান,শামশুল হক,কাজী গোলাম মাহবুব, আব্দুল ওয়াহেদ চৌধূরী,অলি আহাদ সহ উনুসত্তর জন।১১ মার্চের ঘটনার প্রতিবাদ ও রাষ্ট ভাষা বাংলার দাবিতে১৩ থেকে ১৫ ই মার্চ ধর্ম ঘাট পালিত হয়।আন্দোলন তীব্রতার মুখে খাজা নাজিমুদ্দীন সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে বৈঠকে মিলিত হন।তবে ১৯৪৮ সালের ১৯শে মার্চ গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঢাকায় আসেন।২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষনা করেন উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট ভাষা।তার এরুপ উক্তিতে আপমর বাঙালি জনসাধারন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।২৪শে মার্চ কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ একই ধরনের বক্তিতা দেন।তখন উপস্হিত ছাত্ররা সমস্বরে না না বলে চিৎকার করে ওঠে।৩১ মার্চ আব্দুল মতিন কে আহ্বায়ক করেরাষ্ট ভাষা সংগ্রাম পরিষদ আবার নতুন করে গঠিত হয় এবং আন্দলন নতুন ভাবে সংগঠিত হতে থাকে১৯৫২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্ম ঘাট পালিত হয়।২১ শে ফেব্রুয়ারি দেশ ব্যপি সাধারন ধর্ম ঘাট এবং ঐ দিন রাষ্ট ভাষা দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়।কাজী গোলাম মাহবুব কে আহ্বায়ক করে চল্লিশ সদস্য বিশিষ্ট একটি সর্বদলিয় রাষ্টভাষা পরিষদ গঠিত হয়।তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমুন্ত্রি নুরুল আমিন ঢাকা শহরে ২০ শে ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষনা করেন।কিন্তু ছাত্র দের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় যে তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করবে।রাষ্টভাষা বাংলা চাই স্লোগান সহকারে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হলে কিছু ছাত্র গ্রেফতার হয় ।পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়।ছাত্রদের বড় অংশ মেডিকেল কলেজের কাছে সমাবেত হয়।পুলিশ আকস্মিক ভাবে গুলি বর্ষন করে।পুলিশের গুলিতে সংগ্রামী ছাত্র নেতা এম এ শ্রেনির ছাত্র বরকত, সালাম, জব্বর ও বাদাম তলীর কমার্শিয়াল প্রেসের মাশলিকর ছেলে রফিক শহীদ হন।এ ঘটনার পেক্ষিতে কারারূদ্ধ জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুহিউদ্দীন আহমদ ভাষা আন্দোলনের সর্মথনে কারা অভ্যন্তরে অনশন করেন।ফলে প্রবল আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্টভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।পরবর্তি সময়ে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা কে অন্যতম রাষ্টভাষার মর্যাদা দেয়।১৯৫২ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি নির্মিত হয় একুশের প্রথম শহিদ মিনার যা বাঙালির পরবর্তি সব আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দবিন্দু হিসাবে কাজ করে।
পরিশেষে বলতে চাই অনেক কস্টে অর্জিত গর্বের এই বাংলা ভাষা যেন রাস্ট্রের প্রতিটা ক্ষেত্রে ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষার জন্য আত্নত্যাগের সফলতা ও ভাষা তার সম্মান যেন ফিরে পাই।
Leave a Reply